রামায়ণের লঙ্কাকান্ড অনুসরণে রাবণ চরিত্র বিশ্লেষন করো।

Syed Sohali
0

 ''রামায়ণের লঙ্কাকান্ড'' অনুসরণে রাবন চরিত্র বিশ্লেষন করো। (পূর্ণমান-১০) Burdwan University 

''রামায়ণের লঙ্কাকান্ড'' অনুসরণে রাবন চরিত্র বিশ্লেষন করো।

উত্তর:- ভারতীয় জীবন ও প্রাণরসের সঙ্গে রামায়ণ কাহিনী গভীর আত্মীয়তায় আবদ্ধ, তাই রামায়ণ জীবন রসের কাব্য। নরনারীর চিরায়ত প্রেম-ভালোবাসা এখানে কৃত্তিবাস বিশেষ ভাবে যুক্ত করেছেন। কিন্তু মূল রামায়ণের চরিত্র গুলি যতটা মহৎ, বৃহৎ ও উজ্জ্বল হয়েছে কৃত্তিবাসের চরত্র গুলি ততটা গৌরব লাভ করতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে অশিৎকুমার বন্দোপাধ্যায় বলেছেন---''বাল্মীকি লিখেছিলেন মহাকাব্য কৃত্তিবাস বাল্মীকি অবলম্বনে লিখেছিলেন মধ্যযুগিয় পাঁচালি কাব্য।'' বাল্মীকি রামায়ণে রাম-লক্ষন-ভরত, সুগ্রীব-অঙ্গদ-হনুমান, রাবন-বিভিষন-কুম্ভকর্ণ-ইন্দ্রজিৎ, কৈকেয়ী-মন্থুরা, সীতা-তারা মন্দোদরী---প্রত্যেক চরিত্র দোষ বা গুনের প্রতিক হয়েও চরিত্র শাতন্ত্র প্রাণান হয়ে উঠেছে। লঙ্কাকান্ডে রাবন চরিত্রটি আলোচনা করতে গিয়ে বলতে পারি রাবন বর্বর হলেও কৃত্তিবাসের হাতে পরে রামের প্রচ্ছন্ন ভক্ত হয়ে উঠেছে। 

                         কৃত্তিবাসের লঙ্কাকান্ডে রাবন পুত্র ইন্দ্রজিৎ যখন মেঘের আড়াল থেকে যুদ্ধ করতে রাম লক্ষণকে নাগপাশে জড়িয়ে ফেলে। এ সংবাদ শুনে রাজসভায় উল্লাসিত হয়ে ওঠে-----

            ''হরিষে যুদ্ধের কথা মেঘনাদ কহে

              রাবন করিয়া কোলে চুম্বদিলো তাহে।'' 

                     এখানে রাবন রাজার বিজয় উল্লাস সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো। লঙ্কার রাজা রাবন বিপুল ঈশ্বয্য  ও প্রতাপেও অধিকারী ছিলেন। রাবন যেমন ছিলেন একদিকে প্রজাবৎসল রাজা ঠিক তেমনি ছিলেন বীর নায়কের মতো যোদ্ধাপুরুষ। তাই মেঘনাদ রাম লক্ষনকে নাগপাশে বেঁধে ফেলার পর রাবন বলেছে-------

                    ''হস্তীঘোড়া রত্ন দিলো ভান্ডার প্রচুর

                     অমূল্য রতন হার তিলক কেয়ূর

                    নানা অলংকার দিলো নীলকান্ত মনি

                    বিদ্যাধরি আনিদিল রূপসী রমনি।''     

                     রাবনের ঈশ্বয্য ও প্রতাপের অধিপতি ছিলো বলেই, দশ মাথা ও বিশ হাত নিয়ে তার পুত্রকে খুশি করেছেন। রাবন বিভীষিকাময় তাই তার পুত্রের নামে মেঘনাদ অর্থাৎ মেঘের মতো নাদ করেন।

                         রাবন বীর বিক্ক্রমে যুদ্ধ করতে বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু মেঘনাদ তাকে বাঁধা দিলেন তা সত্ত্বেও রাবন সুগ্রীব এবং লক্ষণের সঙ্গে যুদ্ধ করলেন। এখানে বীর রাবনের পরিচয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। একদিকে রাজা রাবন, একদিকে পিতা রাবন আবার অন্যদিকে রাবন দাদা---এই বিচিত্র রূপের রাবনকে বীর সৈনিক করে তুলেছে। বোন সুপর্ণখার নাক কাটার প্রতিবাদ ও প্রতিশোধ নিতে রাবন রাম লক্ষণকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে চেয়েছে। আসলে রাবন প্রতিহি সপরায়ণ নয়। তিনি প্রতিবাদ বা প্রতিশোধের মূল্য দিতে চেয়েছেন। দেবতাদের ছলনাবেশ তাকে কখনোই গ্রাস করতে পারেনি। রাবন নিজ ক্ষমতায় সর্বত্রই বলিয়ান।

                            মেঘনাদের মৃত্যুতে রাবনের রাজসিক সত্তার চেয়ে পিতৃ সত্ত্বা বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে। পুত্রের মৃত্যু সংবাদ শুনে রাবনের দমানন কাঁদতে শুরু করেছে। রাবনের কান্না শুনে লঙ্কাপুরির সর্বজন কাঁদতে থাকে। অবশেষে লঙ্কাপুরিতে শোকের ছায়া নেমে আসে। অনেক পুত্রের মৃত্যু হয়েছে কিন্তু ইন্দ্রজিতের মৃত্যু রাবনকে সবচেয়ে বেদনাময় করে তুলেছে। এমনকি রাবন সিংহাসন ছেড়ে আছাড় খেয়ে পড়ে বললেন---- ''ভাই কুম্ভকর্ণের শোকে ছিলাম এতদিন, এবার পুত্র শোকে মরবো। যদি প্রাণ বাঁচে আমার রামের সঙ্গে যুদ্ধ করে, আগে আমি কাটবো চণ্ডাল বিভীষর্ণবেত।'' এখানে রাজা রাবনের থেকেও পিতা রাবনের পরিচয় সবচেয়ে বড়ো হয়ে উঠেছে।

                       রাজা রাবন, পিতা রাবন সব একাকার হয়ে দমানন আত্ম দংশনে দংশিত। ঠিক এই সময়ে রাবনের মতো নিকষা রাবনকে লক্ষ্য করে বলেন------''রাবন! তোমাকে আমি সীতাকে ফিরিয়ে দিতে বলেছিলাম। কিন্তু তুমি আমার কথা শুনলে না! আজ সেই পাপে ইন্দ্রজিৎ আর ইহলোকে নেই''.....জীবিত কেবল তুমি!'' আসলে এই অংশে মাতৃ জননীর মায়া মমতা ও হাহাকার উজ্জ্বল রূপে প্রকাশ পেয়েছে। রাবন নিজে কখনোই যুদ্ধে পরাজিত হতে চাননি। তাই রাবন চরিত্রের মধ্যে পিতৃত্বের ও সম্রাটের সার্থক সমন্বয় দেখা গেছে। 

                         কৃত্তিবাসের রাবন কোনো জায়গায় হীন নয় । কারণ রাবন নিজের দুষ্কর্মের জন্য বারবার অনুশোচনা করেছেন।এমনকি কুম্ভকর্ণের অকাল নিদ্দ্রা ভঙ্গের জন্য----''আমি মহেন্দ্রের সমান হয়েও একজন মনুষ্য কতৃক নির্জিত হলাম।'' বলে আক্ষেপ করেছেন। আসলে রাবন অসীততেজ বিদ্দ্রোহী হলেও শিবের ভক্ত। পুত্রের মৃত্যুতে শোক বিহ্বল হয়েও জাতির কল্যাণ ও গৌরবের জন্য তিনি উৎকণ্ঠিতো। কৃত্তবাসের রাবন অনুতাপ করেছে-----

               ''সর্বাঙ্গ পুড়িছে মোর মুনষ্যের বাহন

              রাজা হয়ে হারিলাম জিনে কোন জনে।''

                           রাম লক্ষনকে মাতা নিকষা, স্ত্রী সন্দহরি যতই দেবতা বলে গ্রহণ করুক রাবন তাদেরকে কিছুতেই সাধারণ মানুষের উর্ধে স্থান দেননি। বাল্মীকি সীতা অপহরনকারী রাবনকে কামুক বলে চিহ্নিত করলেও কৃত্তিবাসের কলমে রাবন একজন প্রজাবৎসল রাজা এবং পিতৃশীল পিতা। চিরন্তন মহাকাব্যিক অশুরদের মতোই নীতি ধর্মে অঞ্চল ও অন্তরে ঈশ্বরেয় প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি এক শ্রেষ্ঠ রাক্ষস রাজা রূপে রাবনকে আমাদের সামনে হাজির করেছেন। কৃত্তিবাস রাবনের এই চরিত্র অঙ্কনে নিজস্ব প্রতিভার গুনে রাবনকে মহামানব করে তুলেছেন। তাই কৃত্তিবাসের রাবন লঙ্কাকান্ডে একটি উজ্জ্বল চরিত্র রূপে বিরাজমান।


                            -------------------------

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Accept !) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !
To Top