পাল প্রতিহার ও রাষ্ট্রকুটদের মধ্যে অনুষ্ঠিত ত্রিশক্তি সংগ্রামের ইতিহাস আলোচনা কর। Burdwan University (পূর্ণমান-১০)
উত্তর:- ১৬৪৭ খ্রীঃ হর্ষবর্ধনের মৃত্যুতে উত্তর ভারতের এক বিস্তীর্ণ অংশের রাজনৈতিক ঐক্য বিনষ্ট হয় এবং আর্যাবর্তের নানা স্থানে কয়েকটি শক্তিশালী স্বাধীন রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে। এইসব রাজ্যগুলির মধ্যে রাজপুতানা ও মালবের প্রতিহার রাজ্য এবং বাংলা-বিহারের পাল রাজ্য উল্লেখযোগ্য। এই দুই শক্তি ও দক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট রাজ্য আর্যাবর্তে একচ্ছত্র অধিপত্য স্থাপনে সচেষ্ট হয়। আর্যাবর্তে প্রাধান্য স্থাপনের জন্য তাদের মধ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয় তা ‘ত্রি-শক্তির যুদ্ধ' নামে পরিচিত।
দ্বন্দ্বের কারণ:- হর্ষের মৃত্যুর পর উত্তর ভারতের রাজনৈতিক শূন্যতা ঢাকতে পাল, প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূট শক্তির সক্রিয় ভূমিকা লাভের পিছনে বেশ কিছু কারণ ছিল। প্রথমত: হর্ষবর্ধনের সময় কনৌজকে কেন্দ্র করে যে সামাজিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তার একচ্ছত্র অধিপতি হওয়ার জন্য পাল, প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূটশক্তি দ্বন্দ্বে মেতে ওঠে। দ্বিতীয়ত, খ্রীষ্টিয় অষ্টম শতকের মাঝামাঝি সময়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলি কনৌজের উপর আধিপত্য স্থাপন করে হর্ষের মত মান-মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আশায় পারস্পরিক সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত কনৌজের ভৌগোলিক ক্ষেত্রে অনুকূল অবস্থান প্রতিবেশী রাজ্যগুলিকে প্রলুব্ধ করেছিল। এখানকার উর্বর বিস্তীর্ণ গাঙ্গেয় উপত্যকা অঞ্চলের উপর কর্তৃত্ব স্থাপনের বাসনা দ্বন্দ্বের আর একটি কারণ। চতুর্থত : কনৌজে একটি বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। এর সংলগ্ন এলাকাগুলিও বেশ সমৃদ্ধশালী।
প্রথম পর্বঃ- প্রতিহার বংশীয় বৎসরাজ (৭৭৫-৮০০ খ্রীঃ) রাজপুতানা ও মধ্যভারতে নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে পূর্বদিকে রাজ্যবিস্তারে উদ্যোগী হন। এ সময় বাংলার পালরাজা ধর্ম পালও (৭৭০-৮১০ খ্রীঃ) সমগ্র বাংলা ও বিহার জয় করে পশ্চিম দিকে। অগ্রসর হচ্ছিলেন। এ অবস্থায় তাঁদের মধ্যে সংঘর্ষ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। দোয়াব অঞ্চলের এক যুদ্ধে ধর্মপাল পরাজিত হন। বৎসরাজ্যের এই জয় কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, কারণ রাষ্ট্রকূটরাজ ধ্রুব (৭৮০-৭৯৩ খ্রীঃ) ইতিমধ্যে আর্যাবর্তে হাজির হন। তাঁর হাতে বৎসরাজ পরাজিত হয়ে রাজপুতানার মরু অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এরপর ধ্রুব পালরাজা ধর্মপালের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। এই যুদ্ধে ধর্মপাল পরাজিত হন। ধ্রুব-র পক্ষেও বেশিদিন আর্যাবর্তে থাকা সম্ভব হয়নি। খালিমপুর তাম্রলিপি’, ‘মুঙ্গের শিলালিপি'। এবং নারায়ণ পালের ‘ভাগলপুর তাম্রলিপি' থেকে জানা যায়, রাষ্ট্রকূট ও প্রতিহার তখন সামরিক দিক থেকে শক্তিহীন হয়ে পড়লে, সেই সুযোগে ধর্মপাল তাঁর হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করে কনৌজ পর্যন্ত পাল সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেন। এ সময় কনৌজের রাজা ইন্দ্রায়ুধকে সিংহাসনচ্যুত করে ধর্মপাল নিজের অনুগত এক সামন্ত কর্মী চক্রায়ুধকে কনৌজের সিংহাসনে বসান।
দ্বিতীয় পর্বঃ- দ্বিতীয় পর্বের দ্বন্দ্ব ঠিক আগের মত। প্রতিহার রাজ দ্বিতীয় নাগভট (৮০০-৮২৫ খ্রীঃ) কনৌজের যুদ্ধে চক্রায়ুধকে এবং ‘মুঙ্গেরের যুদ্ধে' ধর্মপালকে পরাস্ত করে, তাঁর রাজধানী উজ্জয়িনী থেকে কনৌজে স্থানান্তরিত করেন। পরাজিত হয়ে ধর্মপাল রাষ্ট্রকুটরাজ ধ্রুবের পুত্র তৃতীয় গোবিন্দের (৭৯৩-৮১৪ খ্রীঃ) কাছে আত্মসমর্পণ করে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেন। । সম্ভবতঃ সেই কারণেই তৃতীয় গোবিন্দ তাঁর বল্লমধারীনী নিয়ে গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমস্থলে হাজির হন। তারপর প্রতিহার রাজ দ্বিতীয় কে পরাস্ত করে হিমালয়ের পাদদেশ পর্যন্ত অগ্রসর হন। কিন্তু রাষ্ট্রকূট পরিবারে পহের খবর পেয়ে তৃতীয় গোবিন্দ এই বিজয়ের সুফল ত্যাগ করে দক্ষিণে ফিরে . ধর্মপাল হৃত গৌরব আবার পুনরুদ্ধার করেন। ডঃ আর. সি. মজুমদার বলেন, ৪টি শূন্যতার সুযোগ ধর্মপাল ক্ষমতা বৃধি করলেও একমাত্র বাংলা ও বিহার ছাড়া অন্য কোথাও প্রত্যক্ষ শাসন প্রবর্তন করতে পারেননি।
তৃতীয় পর্ব:- ধর্মপালের পুত্র দেবপাল (৮১০-৮৫০ খ্রীঃ) প্রতিহার-রাজ রামভদ্র এবং তাঁর উত্তরাধিকারী মিহির ভোজ (৮৩৬-৮৮৫ খ্রীঃ) কে পরাজিত করেন। সম্ভবত রাষ্ট্রকুট-রাজ প্রথম অমোঘবর্ষ (৮১৪-৮৭৮ খ্রীঃ)-ও তাঁর কাছে পরাজিত হন। দেবপালের মৃত্যুর পর পাল সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। ৮৬০ খ্রীঃ রাষ্ট্রকূটদের হাতে পালরাজা নারায়ণপাল (৮৫৪-৯০৮ খ্রীঃ) পরাজিত হন। প্রতিহার-রাজ মিহিরভোজ কনৌজ ও বুন্দেলখন্ড জয় করে মগধের সীমান্তে এসে হাজির হন। পরবর্তী প্রতিহার রাজ মহেন্দ্রপাল (৮৮৫-১১০ খ্রীঃ)-এর আমলে প্রতিহার সাম্রাজ্য গৌরবের চরম শিখরে আরোহণ করে। তিনি বাংলা ও বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে পাল রাজাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেন। ৯১৬ খ্রীঃ রাষ্ট্রকূট-রাজ তৃতীয় ইন্দ্ৰ (৯১৪-৯২২ খ্রীঃ) মহীপাল প্রতিহার (৯১২-৯৪৪ খ্রীঃ)-কে পরাজিত করে কনৌজ দখল করেন। প্রতিহার-শক্তির উত্থান আর সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্রকূটদের সাফল্যে ত্রি-শক্তি যুদ্ধ সমাপ্ত হয়, কিন্তু এই সাফল্যও স্থায়ী হয়নি।
ফলাফল ও গুরুত্ব :- প্রায় দুশ বছর ধরে ত্রি-শক্তির দ্বন্দ্ব চলেছিল। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে এত দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব খুব কম। এই দ্বন্দ্বের ফলাফল বিচারে গুরুত্বও অনেক বেশি। প্রথমত এই দীর্ঘ দ্বন্দ্বে তিনটি পক্ষের প্রত্যেকের যুদ্ধজনিত কারণে প্রচুর আর্থিক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছিল। দ্বিতীয়ত : দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলতে থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলির প্রত্যেকের সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সেই সুযোগে তুর্কীরা অনায়াসে ভারত আক্রমণ করতে পেরেছিল। তৃতীয়তঃ ত্রিশক্তি দ্বন্দ্বের ফলে রাষ্ট্রীয় ঐক্য বিনষ্ট হয়। চতুর্থত : (পাল-প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূট শক্তির মধ্যে হর্ষোত্তর যুগে সার্বভৌম রাজশক্তি অখন্ড সাম্রাজ্য গঠনের যে চেষ্টা শুরু হয় তা ফপ্রসু হয়নি। কারণ কোন শক্তি কিছুটা ঐক্যবদ্ধ হলেও আবার ভেঙে পড়েছিল।
