ধর্মপালের রাজনৈতিক কৃতিত্ব আলোচনা কর। Burdwan University

0

ধর্মপালের রাজনৈতিক কৃতিত্ব আলোচনা কর।  Burdwan University (পূর্ণমান -১০)

উত্তর :- (বাংলার পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপালের স্বপ্ন ছিল সমগ্র আর্যাবর্তে এক সার্বভৌম রাজশক্তি স্থাপন। ৭৭০ খ্রীঃ গোপালের মৃত্যু হলে সিংহাসন লাভ করেন পুত্র ধর্মপাল যিনি তাঁর চল্লিশ বছরের রাজত্বকালে সম্ভব করে তুলেছিলেন তাঁর পিতার পর কে। ধর্মপাল ছিলেন যথার্থই একজন যোগ্য রাজনীতিজ্ঞ এবং সমরকুশলী বীর। তাই বলা হয়ে থাকে যে, “Dharmapala was one of the greatest monarchs of early medieval India.

রাজ্য জয় : ত্রিশক্তি দ্বন্দ্বের যুগে ধর্মপাল প্রতিহাররাজ, বৎসরাজ ও দ্বিতীয় নাগভট্ট এবং রাষ্ট্রকূটরাজ ধ্রুব ও তৃতীয় গোবিন্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সফল হননি ঠিকই, কিন্তু ভাগ্যগুণে কনৌজ ও গাঙ্গেয় উপত্যকায় এক বিস্তীর্ণ স্থান দখল করেন। রাষ্ট্রকূট রাজা দক্ষিণে ফিরে গেলে ধর্মপাল কনৌজের সিংহাসন থেকে ইন্দ্রায়ুধকে অপসারিত করে নিজের অনুগত সামন্তকর্মী চক্রায়ুধকে কনৌজের শাসনভার দেন। ধর্মপাল কনৌজ অতিক্রম করে হিমালয়-এর কেদারতীর্থ (গাড়োয়াল) থেকে গোকর্ণ (নেপাল) পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। খালিমপুর তাম্রলিপি থেকে জানা যায়, সমগ্র উত্তর ভারত জয়ের পর কনৌজ আয়োজিত এক দরবারে উত্তর ভারতের বহু সামন্তরাজা ধর্মপালের প্রতি বশ্যতা জানাতে উপস্থিত হয়েছিলেন। (এঁদের মধ্যে (১) ভোজ (বেরার), (২) মৎস্য (জয়পুর ও আলওয়াল), (৩) মদ্র (মধ্য পাঞ্জাব), (৪) কুরু (পূর্ব পাঞ্জাব ও থানেশ্বর), (৫) কীর (পাঞ্জাবের কাংড়া অঞ্চল), (৬) যবন (সিন্ধুর মুসলিম রাজ্য), (৭) যদু (সৌরাষ্ট্র অঞ্চল), (৮) গান্ধার (পূর্ব পাঞ্জাব), (৮) অবন্তী (রাজপুতানা) প্রভৃতি রাজ্যের রাজারা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

রাজনৈতিক সংহতি : (ধর্মপাল তাঁর আপন যোগ্যতায় ও বাহুবলে বাংলায় রাজনৈতিক সংহতি এবং শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপন করেছিলেন। তাছাড়া আর্যাবর্তের বিশাল উত্তর ভারতে প্রভুত্ব বিস্তারে সফল হয়েছিল। শশাঙ্কের স্বপ্নকে তিনি বাস্তবরূপ দান অংশ জয় করে বাংলার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিলেন। মূলত তাঁর উদ্যোগেই বাংলাদেশ, করেছিলেন। অন্য অর্থে আর. সি. মজুমদারের মতে, 'ধর্মপালের রাজ্য বাঙালীর জীবনপ্রভাত' কথাটি যুক্তিযুক্ত। বাংলার সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।

পরধর্ম সহিষ্ণুতা :- সাম্রাজ্য সংগঠক, সুশাসক এবং সংস্কৃতিচর্চার পৃষ্ঠপোষক একজন ধর্মপীল ছিলেন বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। তিনি বহু বৌদ্ধ মঠ নির্মাণ করেছিলেন যার মাধ্য বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল মগধে নির্মিত বিক্রমশীলা বৌদ্ধবিহার। ধর্মপাল শাস্ত্রানুসারে রাজ্য শাসন করতেন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও তিনি ছিলেন পরধর্মসহিষ্ণু প্রজাহিতৈষী রাজা এমন তথ্য যথেষ্টই আছে যাতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি হিন্দু মন্দিরের জন্য নিষ্কর ভূমি দান করতেন। তাঁর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন গর্গ নামে জনৈক হিন্দু। সুতরা সুশাসক, শিল্প সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক, সমরকুশলী যোদ্ধা, সাম্রাজ্য সংগঠক পরধর্মসহিষ্ণু ধর্মপাল ছিলেন আদি মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

শিল্প, স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষক ঃ- ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন, উত্তর ভারতের এক বিশাল সাম্রাজ্যের উপর ধর্মপাল আধিপত্য স্থাপন করলেও একমাত্র বাংলা ও বিহারে তিনি প্রত্যক্ষ শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। সার্বভৌম শক্তির প্রতীক হিসাবে ধর্মপাল ‘পরমেশ্বর পরম ভট্টারক মহারাজাধিরাজ' উপাধি নিয়েছিলেন। রাষ্ট্রকূটরাজ তৃতীয় গোবিন্দের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে তাঁর কন্যা রন্নাদেবীকে বিবাহ করে ধর্মপাল কূটনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে তাঁর সাফল্যের পিছনে তাঁর ভাই বাক্‌পাল ও ব্রাহ্মণমন্ত্রী গর্গভট্টের অবদান অপরিসীম। ধর্মপালের গুরু বৌদ্ধপণ্ডিত হরিভদ্র তাঁকে বৌদ্ধধর্মে অনুরাগী করে তুলেছিলেন। তাই ধর্মপাল বিক্রমশীলা মহাবিহার, সোমপুরী বিহার ও ওদন্তপুরী বিহার নির্মাণ করে বৌদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার পথ প্রশস্ত রেখেছিলেন।(সাহিত্য, চর্যাপদ, শিল্প-স্থাপত্য, কৃষি, বাণিজ্য ইত্যাদির উন্নতির মাধ্যমে বাংলার জাতীয় জীবনে নতুন সূর্যোদয় ঘটিয়েছিলেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Accept !) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !
To Top