বল্লাল সেনকে কি বাংলায় সেন শাসনের প্রকৃত স্থাপতি বলা যায়? Burdwan university( পূর্ণমান-10)
উত্তর ঃ- দাক্ষিণাত্যের কর্ণাট দেশ থেকে বাংলায় এসে সামন্ত সেন ও হেমন্ত সেন রাঢ় অঞ্চলে প্রাধান্য বিস্তার করেন। তাঁরা সম্ভবত পাল রাজ্যের সামন্ত বলে পরিচিত ছিলেন। পরে পাল রাজাদের দুর্বলতার সুযোগে বিজয়সেন প্রায় সমগ্র বাংলা, কামরূপ ও মিথিলা জয় করেন। অনুমান করা হয় তিনি কলিঙ্গ রাজ্যের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনকরেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর আনুমানিক ১১৫৮ খ্রীষ্টাব্দে পুত্র বল্লাল সেন সিং সিংহা বসেন। নৈহাটি তাম্রপট হল বল্লালসেনের রাজত্বকাল সম্পর্কে প্রধান ও প্রায় এ লিপি। এছাড়া ভাগলপুর জেলার কলহগ্রাম থেকে ১১ মাইল দূরে সনোথার গ্রামে পাওয়া একটি অষ্টধাতু নির্মিত সূর্যের মূর্তির আবরণের উপর একটি লিপি এবং বল্লাল সেন। রচিত 'দানসাগর' এবং 'অদ্ভুতসাগর' নামে রচিত দুটি গ্রন্থ থেকে তাঁর সম্বন্ধে কিছু কিছু বিবরণ জানা যায়। এছাড়া 'বল্লালচরিত' নামে দুটি গ্রন্থ পাওয়া যায়, যাতে বল্লাল সেন। সম্পর্কে অনেক কাহিনী লিপিবদ্ধ আছে। বল্লাল চরিতের একটি গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে এর দুটি খন্ড বল্লাল সেনের অনুরোধে তাঁরা শিক্ষক গোপাল ভট্ট ১৩০০ শকাব্দে। এবং তাঁর বংশধর আনন্দভট্ট কর্তৃক ১৫০০ শকাব্দে রচিত হয়েছিল। এই গ্রন্থের অধিকাংশ কিংবদন্তীর উপর নির্ভর করে রচিত। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে গ্রন্থ দুটির প্রথমটি জাল এবং দ্বিতীয় গ্রন্থটি প্রকৃতই বল্লাল চরিত। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত গ্রহণীয়। নয়। কারণ দুটি গ্রন্থেই কয়েকটি বংশ ও জনপ্রবাদ বর্ণিত আছে। সম্ভবত ষোড়শ অথবা সপ্তদশ শতকে প্রচলিত কিংবদন্তীর উপর নির্ভর করে গ্রন্থ দুটি রচিত হয়েছিল। অতএব প্রমাণের অভাবে বল্লাল চরিতের কোন উক্তিই গ্রহণীয় নয়।
সিংহাসনে বসার পর বল্লাল সেন মগধ ও মিথিলা জয় করেন বলে সমকালীন সাহিত্যে উল্লেখ আছে। 'অদ্ভুতসাগর'-এ তাঁকে “গৌড়েন্দ্র কুঞ্জরালান স্তম্ভবাহুর্মহীপতিঃ”, বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে তিনি গৌড়রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। সম্ভবত তিনি মগধের শেষ শাসককে ১১৬২ অব্দে পরাজিত করে মগধ জয় করেন। ভাগলপুর লিপি ও বল্লাল চরিত থেকে তাঁরা মগধ জয় সম্পর্কে জানা যায়। বল্লাল চরিতে আরো বলা হয়েছে যে, বল্লাল সেন পিতার জীবদ্দশায় মিথিলা জয় করেন। মিথিলা জয়ের বিষয় মিথিলায় সেন সম্বতের ব্যবহার থেকে প্রমাণিত হয়। তাছাড়া মিথিলা সেন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল কারণ নানাদেবের মৃত্যুর অব্যবহিত পরবর্তী শাসকের কোনো বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ পাওয়া যায় না। তাছাড়া প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে বল্লাল সেন নিজ সাম্রাজ্যকে রাঢ়, বরেন্দ্র, বাগড়ী (বর্তমান মেদিনীপুরের গড়বেতা অঞ্চল), বঙ্গ ও মিথিলা-এই পাঁচভাগে বিভক্ত করেছিলেন। সুতরাং বল্লাল সেন মিথিলা জয় করেছিলেন একথা প্রমাণিত সত্য বলে গৃহীত হয়েছে। মনোখার গ্রামে প্রাপ্ত লিপি থেকে জানা যায় যে রাজত্বের ন'বছরে বল্লাল সেন পূর্ব বিহার তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত করেছিলেন।C 'এবং 'অদ্ভুতসাগর'-এর উপসংহারে লিখিত কয়েকটি শ্লোক থেকে যায় যে, বল্লাল সেন তাঁরা শুরু অনিরুদ্ধের কাছে বেন, স্মৃতি, পুরা প্রকৃতি শাস্ত্ৰ অধ্যয়ন করেছিলেন। 'দানসাগর' ও 'অদ্ভুতসাগর' গ্রন্থ দুটির রচনা বল্লাল সেনের পাণ্ডিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এই গ্রন্থে হিন্দু আচার পদ্ধতি ও ক্রিয়াকর্ম সম্বন্ধে লিখিত আছে। বল্লাল সেন এই গ্রন্থ দুটির সাহায্যে হিন্দুসমাজে বর্ণাশ্রম প্রথাকে মজবুত করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি তান্ত্রিক ধর্মমতেরও অনুরাগী ছিলেন বলে জানা যায়। বঙ্গীয় কুলজী গ্রন্থে কৌলিন্য প্রথার উৎপত্তির সঙ্গে বল্লাল সেনের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। কিংবদন্তী আছে তিনি হিন্দু সমাজের ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থের মধ্যে কৌলিন্য প্রথার প্রবর্তন করেন। ডঃ নীহার রঞ্জন রায়ের মতে, বল্লাল সেন ছিলেন অত্যন্ত রক্ষণশীল প্রকৃতি। তিনি সমাজের উচ্চশ্রেণীর মধ্যে কৌলিন্য প্রথা প্রবর্তন করে জাতিভেদ প্রথার কঠোরতা বৃদ্ধি করেন। কৌলিন্য প্রথার মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলে অনেকে মনে করে থাকেন। তাদের মতে বাংলার যে সমস্ত ব্রাহ্মণ বা অন্য শ্রেণী তাঁকে সমর্থন করত না, তিনি তাদের সামাজিক মর্যাদাহানি করেন এবং যারা তাঁকে সমর্থন করত তিনি তাদের স্বতন্ত্র শ্রেণী ও কুলীন বলে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। হরিশচন্দ্র কবিরত্ন সম্পাদিত বল্লাল চরিতের বক্তব্য যদি সত্য হয় তবে বাংলার সুবর্ণ বণিকরা বল্লাল সেনকে সহযোগিতা না করায় তিনি তাদের সমাজে নিম্নজাতিতে পরিণত করেন। বৈদেশিক আক্রমণের প্রাক্কালে বল্লালসেনের কৌলিন্য প্রথা জাতিকে দুর্বল করে দিয়েছিল। এর কুফল ভোগ করতে হয়েছিল পরবর্তী শাসক লক্ষ্মণ সেনকে। মুসলিম আক্রমণের সময় লক্ষ্মণ সেন বাংলার আপামর জনগণের সমর্থন ও সক্রিয় সাহায্য: থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। ফলে সহজেই ইখতিয়ার উদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি বাংলা জয় করেন এবং সেন রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে বাংলায় তুর্কী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। সুতরাং দেখা যায়, বল্লাল সেন কর্তৃক প্রবর্তিত কৌলিন্য প্রথা বালার সমাজকে বিভক্ত ও দুর্বল করে দিয়েছিল যার পরিণাম ছিল ভয়ানক। বিভিন্ন আগাদির ভিত্তিতে একথা বলা যায় যে, বল্লাল সেন পিতৃরাজ্য অক্ষুন্ন রেখেছিলেন।
