বাংলা কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের অবদান আলোচনা করো ? Burdwan University (পূর্ণমান-10)
উত্তর:-
বাংলা কথাসাহিত্যে শরৎচন্দ্রের অবদান :-
বাংলা সাহিত্যের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮)। রবীন্দ্র সূর্য যখন বাংলা সাহিত্যাকাশের মধ্যগগণে বিরাজ করছিল তখন ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে কুন্তলীন পুরস্কার পাওয়া ‘মন্দির’ গল্পটির মধ্য দিয়ে পরবর্তীকলের এই জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকের বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাব ঘটে। এরপর ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে ‘ভারতী’ পত্রিকায় ‘বড়দিদি’ গল্পটির মাধ্যমে তিনি পাঠক সমাজের সাথে পরিচিত হন। যদিও গল্পটির প্রকাশের সময় অনেকে মনে করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ হয়ত ছদ্মনামে এই গল্পটি রচনা করেছেন। এরপর একের পর এক জনপ্রিয় উপন্যাস ও ছােটগল্প রচনার মধ্য দিয়ে শরৎচন্দ্র পাঠক সমাজের একেবারে কাছাকাছি চলে আসেন। শরৎচন্দ্রের পূর্বে বাংলা কথাসাহিত্যের পাঠক বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর অনুগামীদের দ্বারা ঐতিহাসিক উপন্যাস ও ইতিহাস শাসিত উপন্যাসের এবং রবীন্দ্রনাথের কিছু তত্ত্ব-দর্শন মূলক উপন্যাস পাঠ করেছিল। শরৎচন্দ্র প্রথম এই পাঠকদের ইতিহাস ও তত্ত্বকথার মায়াজাল থেকে বের করে বাস্তব নরনারীর জীবন নির্ভর কাহিনির প্রতি আকৃষ্ট করেন।
ড. শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুসরণে আমরা শরৎচন্দ্রের রচনাগুলিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করতে পারি।
১) পারিবারিক কাহিনি চিত্র :- ‘বিন্দুর ছেলে’ (১৯১৪), “রামের সুমতি’ (১৯১৪), মেজদিদি’ (১৯১৫), ‘মামলার ফল, ‘নিস্কৃতি’ (১৯১৭), ‘বৈকুণ্ঠের উইল’ (১৯১৫), ‘একাদশী বৈরাগী’ (১৯১৮), ‘মহেশ’ (১৯২৬) ইত্যাদি।
২) সমাজ বিধির প্রাধাণ্য চিহ্নিত দাম্পত্য প্রেম ও বিরহের কাহিনি :- ‘বড়দিদি’ (১৯১৩), ‘পরিণীতা’ (১৯১৪), “বিরাজ বৌ’ (১৯১৪), “দর্পচূর্ণ’ (১৯১৫), ‘পথনির্দেশ’ (১৯১৪), ‘চন্দ্রনাথ’ (১৯১৬), ‘দেবদাস’ (১৯১৭), কাশীনাথ’ (১৯১৭), “স্বামী’ (১৯১৮), ‘ছবি’ (১৯২০) এবং ‘সতী’ (১৯৩৪) ইত্যাদি।
৩) সমাজ সংস্কার মূলক উপন্যাস :- ‘পল্লীসমাজ’ (১৯১৬), ‘অরক্ষণীয়া’ (১৯১৬) এবং বামুনের মেয়ে’ (১৯২০)।
৪) পূর্বরাগ পুষ্ট মধুরান্তিক প্রেমের উপন্যাস :- ‘দত্তা’ (১৯১৮) এবং “দেনাপাওনা’ (১৯২৩)।
৫) নিষিদ্ধ সমাজ বিরােধি প্রেমের উপন্যাস :- ‘চরিত্রহীন’ (১৯১৭), ‘গৃহদাহ’ (১৯২১) এবং শ্রীকান্ত (১ম পর্ব- ১৯১৭, ২য় পর্ব-১৯১৮, ৩য় পর্ব ১৯২৭, ৪র্থ পর্ব ১৯৩৩।
৬) মতবাদ প্রধাণ উপন্যাস্ট :- “পথের দাবী’ (১৯২৬), ‘শেষ প্রশ্ন’ (১৯৩১) এবং ‘বিপ্রদাস’ (১৯৩৪)।
শরৎচন্দ্রের পারিবারিক উপন্যাসগুলিতে বাঙালী পরিবারে নানা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিরােধ ও ঘাতপ্রতিঘাতের ছবি আছে। এই রচনাগুলিতে শরৎচন্দ্র তার বাস্তত অভিজ্ঞতার দ্বারা বাঙালী পরিবারের জীবন্ত ছবি এঁকেছেন। তিনি পরিবারে গন্ডীর মধ্য থেকেই এই সমস্ত উপন্যাসের চরিত্রগুলিকে সুসম, সূক্ষ্ম, মনস্তাত্ত্বসম্মত ভাবে সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন। এক্ষেত্রে গ্রামীণ অশিক্ষিত-অল্পশিক্ষিত মানুষরাই প্রাধাণ্য পেয়েছে। ‘রামের সুমতি’, ‘মামলার ফল’, ‘বৈকুন্ঠের উইল’ প্রভৃতি রচনাগুলি পড়লেই তা জানা যায়। শরৎচন্দ্র নারী হৃদয় ও নারীর প্রেমকে সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তার সমাজবিধির প্রাধাণ্য চিহ্নিত দাম্পত্য প্রেম ও বিরহের কাহিনিগুলিতে এই শ্রেণির রচনাগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য হল ‘বড়দিদি’ ও ‘দেবদাস’। বড়দিদি’-তে সমাজগন্ডীর মধ্যে থেকেও এক বিধবার প্রেমকে শরৎচন্দ্র মাধূর্য দান করেছেন; ‘দেবদাস’- এর নায়িকা পার্বতী নিজ স্বামী ও পরিবারের প্রতি কর্তব্য পালনে কোন ত্রুটি না রেখেও নিজ হৃদয়কন্দরে তার বাল্যপ্রেমকে কিভাবে আঁকড়ে রেখেছিল তার পরিচয় আছে। প্রেমের ছোয়ায় এক বারবণিতাও কিভাবে শুদ্ধ হয়ে ওঠে শরৎচন্দ্র তা এই উপন্যাসের চন্দ্রমুখী চরিত্রের মাধ্যমে দেখিয়েছেন। আর ‘বিরাজ বৌ’ উপন্যাসে শরৎচন্দ্র নারীর প্রেমকে অন্য মাত্রায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
ইংরেজবিরােধি আন্দোলনের সময় শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’ বিপ্লবীদের মধ্যে বেশ প্রভাব ফেলেছিল। এ কারণেই ইংরেজ সরকার উপন্যাসটি বাজেয়াপ্ত করতে বাধ্য হন।
যাইহােক শরৎচন্দ্র দীর্ঘদিন বাংলা সাহিত্যের চর্চা করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে এক নতুন মাত্রায় পৌছে দিয়েছেন। যেসব কারণে শরৎচন্দ্রের রচনা বাংলা সাহিত্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল সেগুলি হল
প্রথমত:-
শরৎচন্দ্র প্রথম বাংলাকথা সাহিত্যকে বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ‘বাবু কালচার’-কে ভেঙে বাংলার বহু বিচিত্র পেশায় জড়িত মানুষ ও তাদের জীবনাচরণের ছবি নিয়ে আসেন। তাঁর রচনায় জমিদার থেকে শুরু করে চাষীর ছেলে, কামার, কুমাের, ঘরামী, সাপুরে প্রভৃতি বিভিন্ন পেশা ও বৃত্তিতে নিয়ােজিত মানুষেরা প্রাধান্য পায়। শরৎচন্দ্রের পূর্বে এরূপ মানুষ জনের সঙ্গে বাঙালী পাঠকের ততটা পরিচয় হয়নি।
দ্বিতীয়ত:-
শরৎচন্দ্র প্রথম চালচুলােহীন, ভবঘুরে হয়ে জীবন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পথ দেখান। তিনি নিজ জীবন ও কীর্তি দিয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপণ করেছিলেন পরবর্তীকালে ‘কীর্তিবাস গােষ্ঠী’ বা ‘হাঙ্গেরী কবিতা আন্দোলনে তার অভিক্ষেপ ধরা পড়েছে।
তৃতীয়ত:-
শরৎচন্দ্র প্রথম ইতিহাস-তত্ত্ব নির্ভর সাহিত্যকে পরিত্যাগ করে বাস্তব নির্ভর সাহিত্য রচনায় উদ্যোগী হন। তাই বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে যখন কল্লোল গােষ্ঠী’-র দ্বারা বাস্তব নির্ভর সাহিত্য রচনার প্রচেষ্টা শুরু হয় তখন এরা শরৎচন্দ্রের কাছে অঞ্জলি পাতেন।
চতুর্থত:-
শরৎচন্দ্রের রচনায় বুদ্ধিদীপ্তি না থাকলেও সহজতা এবং আবেগের এমন স্পর্শ আছে যা খুব সহজেই মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে পারে। চমকসৃষ্টি না করে বা কল্পনার আশ্রয় না নিয়েও যে জনপ্রিয়তা লাভ করা যায় তা শরৎচন্দ্র প্রথম করে দেখান। এসব কারনেই শরৎচন্দ্র তার সময় থেকে এখনও পর্যন্ত সমানভাবে বাঙালী হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। শরৎচন্দ্রের রচনাবলী ইংরেজিসহ বিভিন্নভাষাতে অনুদিত হয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তার রচনাগুলি থেকে এখনও সিনেমা তৈরি হচ্ছে এবং টেলিভিশনে ধারাবাহিক নির্মিত হচ্ছে। একজন রচয়িতার মৃত্যুর এত বছর পরেও এরূপ জনপ্রিয়তা তার প্রতিভাকে স্বীকৃতি দেয়। এইসব কারণে বলাই যায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শরৎচন্দ্রের গুরুত্ব অপরিসীম।

.png)