1. মন্দির গল্পের অপর্ণার চরিত্র আলোচনা করো। অথবা, মন্দির গল্প অবলম্বনে অপর্ণা চরিত্রের পরিচয় মাও। মন্দিরে কোন কোন
উত্তর :- দেব-দেবীর বিগ্রহ ছিল। উত্তর : (শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অমর কথাশিল্পী। চরিত্র সৃষ্টিতে শরৎচন্দ্র অদ্বিতীয়। বিশেষ করে নারী চরিত্র সৃষ্টিতে শরৎচন্দ্রের জুড়ি মেলা ভার। সে রমনীর প্রেম হোক কিংবা জননীর স্নেহ। সব ক্ষেত্রেই শরৎচন্দ্র স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেছেন। নারী হৃদয়ের দুর্ভোয় ও রহস্যাবৃত দিকটি তাঁর লেখনীর দু-একটি আঁচড়ে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর 'মন্দির' নামক গল্পের মধ্যে অপর্ণা নামে যে নারীটির চরিত্র তুলে ধরেছেন, তাকে সাধারণ নারী হিসাবে বিচার করলে চলবে না। কেন না, তার মানসিক গঠনটাই, এখানে মুখ্য উপজীব্য। ইতিপূর্বে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের 'বিসর্জন' নাটকের কল্যানে অপর্ণা নামটির মধ্যে যে স্নিগ্ধতা, প্রেমময়তা পরিবেশিত হয়েছিল আলোচ্য গল্পে তার কণামাত্রও সন্ধান করা যায় না। আলোচ্য গল্পের মধ্যে অপর্ণা হল জমিদার রাজনারায়ণ বাবুর মাতৃহারা কন্যা। মাতৃহারা হওয়ার কারণে তার বেড়ে ওঠার মধ্যে সাংসারিক সহবৎ শিক্ষার অভাব ছিল। ফলত, কোনো একজন মেয়েরসংসারে কী ভূমিকা তা তার শেখা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু সে শিখেছিল কী করে মন্দিরের পুজো করতে হয়, কী করে মদনমোহনের বিগ্রহের পুজোর জোগাড় করতে হয় ইত্যাদি। কিন্তু এখানেও সে তার নিজের মতো করে পুজোর আনুষ্ঠানিকতার ওপর আয়োজনের আড়ঘরের ওপরে সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার ফলে, নিজের জীবনের সজীবতা হারিয়ে ফেলেছিল। তার মন কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, বড় চন্দনের বাটি, নৈবেদ্যের থালা, পুজোর ফুল ও মদনমোহনের ফুলের মালায়। আয়োজিত দ্রব্য পুরোহিত মশাই যথাযথভাবে ব্যবহার করছেন কিনা, সেই দিকেই তার দৃষ্টি সবিশেষ ভাবে নিয়োজিত ছিল।
শৈশবে মাতৃহারা হওয়ার কারণে, অপর্ণা সংসারের অন্দরমহলের শিক্ষা পায়নি। ফলে সংসার জীবনে নারীর ভূমিকা বিষয়টি তার কাছে অজানা থেকে গেছে। তাই তার মন্দির সর্বস্ব জীবনে অমরনাথ স্বামী হিসাবে এলেও তার মনে কোনো আবেগ রচিত হয়নি। নতুন দাম্পত্য জীবনও এর ফলে হয়ে পড়েছিল নিস্তরঙ্গ। ফলে দাম্পত্যজীবনে কোনো স্বর্গসুখ রচনা করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। স্বামীর সঙ্গে বাদানুবাদ, মান-অভিমানের কোনো ক্ষেত্রই সে প্রস্তুত করতে পারে নি। উপরন্তু তার স্বামী অমরনাথ যখন বাদানুবাদের মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্ককে সহজ করতে চেয়েছে, সেখানেও অপর্ণা বাদানুবাদ এড়িয়ে গিয়ে স্বামীর মনোগত অভিপ্রায়কে সমূলে বিনষ্ট করে দিয়েছে। ফলে তার দাম্পত্য জীবনে কোনো মায়াই জন্মাতে পারে নি। তাই অমরনাথের অকাল মৃত্যুতে তার শোক হয়নি। সে অনায়াসে তার পিতার সঙ্গে পিত্রালয়ে ফিরে এসেছে। আর মদনমোহন তার সেবা নেবার জন্যই তাকে আবার ফিরিয়ে এনেছে – এই বিশ্বাসে খুঁশি হয়ে সে বৈধবা জীবন যাপন করেছে।
(অমরনাথের মৃত্যুর পর পিতৃগৃহে মদনমোহন মন্দিরের নতুন পুরোহিত হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিল শক্তিনাথ। শক্তিনাথ পুজোর কাজে দক্ষ ছিল না। অপর্ণা প্রথমে তাকে অপছন্দ করলেও পরে অধর্ম হবে ভেবে দরিদ্র ব্রাহ্মণের পুত্রকে কাজে বহাল রেখেছিল) কিন্তু সেই শক্তিনাথ যখন শহরে গিয়ে অপর্ণার জন্য স্নেহ-শ্রদ্ধাপরবশ হয়ে দিলখোস তাক্ষর (সেন্ট) দুটো শিশি এনে দিয়েছিল, অপর্ণা সেই উপহার পাওয়া মাত্রই তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। সেই উপহারের মধ্যে যে স্নেহ শ্রদ্ধা নিহিত ছিল তাকে বিচার করার শক্তি তার ছিল না। কেন না, তার মন মদনমোহনের পূজোর আড়ম্বরেই পূর্ণ ছিল, পুজো থেকে প্রাপ্ত মানবতা তথা প্রেম জন্মাতে পারে নি। শক্তিনাথের মৃত্যুসংবাদ শোনার পরে। অপর্ণার মনে মানবতার সঞ্চার হয়েছিল।
মন্দিরে মদনমোহন ও শ্রীরাধার বিগ্রহ ছিল। অর্থাৎ মন্দিরটি ছিল রাধা-কৃষ্ণের মন্দির ||
