মণিহারা'গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করে।
ভূমিকা :- নামকরণের সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ইংরেজি কবি নাট্যকর সেক্রেপিয়ার বলেছেন নামে কি আসে যায় । গোলাপ কে যে নামেই ডাকা হোক না কেন সে একই বা সমান গন্ধ বিতরণ করবে । কিন্তু রবীন্দ্রনাথ মতে সাহিত্যে গোলাপকে গোলাপ বলেই ডাকতে হবে। বাস্তবপক্ষে সাহিত্য রচনা একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
সাহিত্যের নামকরণ বিভিন্নভাবে করা হয়ে থাকে সাধারণত সাহিত্যের নামকরণ তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে যথা :- ১) চরিত্র কেন্দ্রিক নামকরণ ২) বিষয়বস্তুগত নামকরণ ৩) প্রতীক ধর্মী বা ব্যঞ্জনা ধর্মী নামকরণ । নামকরণের মাধ্যমে প্রতিটি গল্পের গভীরে ও অন্তরে প্রবেশের ছাড়পত্র পায়। এখন আমাদের অনার্য বিষয় হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিবেচিত মনিহারা গল্পে নামকরণ কথাটি সার্থক এবং সাহিত্যপূর্ণ হয়েছে ।
উত্তর :- ‘মণিহারা' নামটি কতকটা দ্ব্যর্থবোধক। গল্পের নায়ক ফণিভূষণের স্ত্রীর নাম মণিমালিকা। ফণিভূষণ তাকে আদর করে ‘মণি” বলে ডাকে। রবীন্দ্রনাথ চরিত্রের নামকরণের মাধ্যমেই গল্পের নামকরণকে সার্থক করে তুলতে চেয়েছেন। ‘ফণিভূষণ’-এর অর্থ ফণীতে ভূষণ যার অর্থাৎ মণি যার ফণীর শোভা। গল্পে ফণিভূষণের সেই মণি হারিয়ে গেছে। ফণিভূষণের স্ত্রী মণিমালিকার অকালমৃত্যু ঘটেছে গল্পে। সুতরাং ফণিভূষণ স্ত্রী এবং স্ত্রীর গহনা হারিয়ে প্রকৃতপক্ষেই মণিহারা হয়েছেন।
গল্পটির বিষয়বস্তু আলোচনা করলে দেখা যায়, ব্যবসায়ী ফণিভূষণ সাহার চমক ভাঙে অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় বসা স্কুল মাষ্টারের প্রশ্নে। ফণিভূষণ সাহা কাঠ ও রেশমের ব্যবসা করেন। এখানে এসেছেন রাঁচি থেকে। বাড়ীতে তাঁর সুন্দরী স্ত্রী আছে। ইস্কুল মাষ্টার তাঁকে তাঁরই জীবনের পনের বছর আগে ঘটে যাওয়া কাহিনী শোনান। ফণিভূষণের ব্যবসার প্রধান স্থান এখানে হলেও জন্মস্থান ফুলবেড়ে। পিতৃব্য দুর্গামোহনের সম্পত্তি ও ব্যবসার উত্তরাধিকারী হয়ে তিনি বসবাস শুরু করেন। তাঁর সুন্দরী স্ত্রী মণিমালিকা। স্ত্রীকে ভালোবাসলেও সারাদিন তাঁর ব্যবসার পেছনেই কেটে যেত। আচার-আচরণে ছিলেন সম্পূর্ণ সাহেব। নব্যবঙ্গদের যেসব বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তার সবই ফণিভূষণের মধ্যে ছিল। অসুখ করলে ডাক দিতেন অ্যাসিস্টান্ট সার্জেন্টকে। কিন্তু তাঁর সঙ্গে স্ত্রীর দূরত্ব যে ক্রমশ বাড়ছে তা বুঝতে পারেন নি। তিনি দানকেই প্রতিদান বলে মনে করতেন। স্ত্রীকে অসংখ্য রত্ন, মণিমাণিক্য দিয়েই তুষ্ট করতে চাইতেন। স্ত্রীও স্বামীকে তাঁর অলংকার যোগানের যন্ত্রই মনে করত, স্বামীর বদলে স্বামীর দেওয়া অলংকারকেই মণিমালিকা বেশী ভালোবেসে ফেলে। ঠিক সেই মুহূর্তে ফণিভূষণের ব্যবসায় একটি বাধা এসে পৌঁছায়। বাজারে বিস্তর দেনা হয়ে যায়। দেনা থেকে কিভাবে মুক্তি পাবেন ভাবতে ভাবতে তাঁর মনে পড়ে যায় স্ত্রীর গহনার কথা। তিনি মহাজনদের কাছে গয়না বন্ধক দিয়ে টাকা জোগাড় করার কথা ভাবেন। কিন্তু স্ত্রীকে কথাটা বলার মতো ক্ষমতা তাঁর ছিল না। শেষে অর্থ আদায়ের চেষ্টায় ফণিভূষণ গেলেন কলকাতার উদ্দেশ্যে। কিন্তু কলকাতায় পৌঁছানোর কয়েকদিন পরে পত্র মারফত জানতে পারেন তাঁর স্ত্রী পিত্রালয়ে গেছে কিছুদিনের জন্য। দিন দশেক কলকাতায়। কাটিয়ে ফণিভূষণ বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে দেখতে পেলেন না। শেষ পর্যন্ত ফণিভূষণ ফাঁকা সিন্দুক আবিষ্কার করে সম্পূর্ণ ঘটনাটি অনুমান করলেন। মণিমালিকার কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। ফণিভূষণ হয়ে গেলেন একা। কিন্তু সর্বক্ষণই মণিমালিকার কথা চিন্তা করতে লাগলেন ফণিভূষণ। অবশেষে এক রাত্রে চিরকালের জন্য লুপ্ত হয়ে যাওয়া মণিমালিকাকে দেখলেন অতিপ্রাকৃত এক মুহূর্তে। ব্যাকুল দৃষ্টিতে ফণিভূষণ দেখলেন — “সেই কালো তারা, সেই ঘন দীর্ঘ পক্ষ্ম, সেই সজল উজ্জ্বলতা, সেই অবিচিলিত দৃঢ় শান্ত দৃষ্টি।” আঠারো বছর আগে যেভাবে মণিমালিকাকে দেখেছিলেন সেভাবেই দেখলেন। পার্থক্য কেবল মানুষ আর করলে। এক অতলস্পর্শ সুপ্তির মধ্যে ফণিভূষণ নিমগ্ন হলেন।
রবীন্দ্রনাথ এক অতিপ্রাকৃত ঘটনাকে এখানে উপস্থাপিত করেছেন। গল্পের নাম দিয়েছেন তিনি 'মণিহারা'। মণিমালিকা অলংকারকেই ভালোবাসত। স্বামীর কাছে তার একমাত্র দাবি ছিল স্বর্ণালংকার। মৃত্যুর পরও তা সে ভুলতে পারে নি। মৃত্যুর পর কালরূপী মণিমালিকা যখন ফণিভূষণকে দেখা দিল তখন সে অলারে আভূষিতা। 'মণিহারা' ফণিভূষণ তখন সেই কষালের মধ্যেই তার বিয়ের রাতে দেখা “মণি'র অনুসন্ধান করতে লাগলেন। কিন্তু সেখানে তাঁর হারিয়ে যাওয়া ‘মণি’কে তিনি পেলেন না। কমল দেখে হয়ত তিনি ভয়ই পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এই অতিপ্রাকৃত ঘটনার মধ্যে দিয়ে এই সত্যই উদ্ঘাটন করতে চেয়েছিলেন যে বিয়ের দিন থেকে ফণিভূষণ আসলে মণিকে হারিয়েই ফেলেছিলেন। তিনি মণিকে অলঙ্কর উপহার দিতে দিতে তার মনটাকে কঠিন স্বর্ণের ন্যায় করে ফেলেছিলেন। তিনি স্ত্রীর কাছে কোনো দিনই 'স্বামী' হতে পারে নি। কালরূপী মণিমালিকা সেই স্বর্ণধাতু নির্মিত স্ত্রীটির উপমা। মণিমালিকার গহনালিপ্সা তার এবং তার স্বামীর মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান সৃষ্টি করেছিল। তা ঘোচাতেই সে প্রতিরাতে আসত, কিন্তু শেষে দেখা যায় ফণিভূষণকে সে তার সাথে নিয়ে যেতে পারে নি। কারণ, স্বামী নামক 'মণি'টিকে সে প্রকৃতপক্ষে মণির বিনিময়ে বহু পূর্বেই হারিয়ে ফেলেছে। তাই রবীন্দ্রনাথের 'মণিহারা' নামটি গল্পে বেশ সার্থকভাবেই প্রযুক্ত হয়েছে।
PDF Link ✅
.png)