হারানের নাতজামাই গল্পটি গড়ে উঠেছে তেভাগা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আলোচনা কর।

Official
0

হারানের নাতজামাই গল্পটি গড়ে উঠেছে তেভাগা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে—আলোচনা কর।



উত্তর ঃ তে-ভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে হারানের নাতজামাই  গল্পটি যেহেতু গড়ে উঠেছে, সেহেতু গল্পটিকে লেখক বক্তব্যকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। গল্পে মূল নায়ক হিসেবে কাউকে highlight করেননি। চরিত্র নির্মাণও করেছেন মূল বক্তব্যকে সামনে রেখে। গল্পটি বক্তব্যগত শ্রেণীপর্যায়ের গল্প।

যে তে-ভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে 'হারানের নাতজামাই' গল্পটি রচিত, সেই তে-ভাগা আন্দোলন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে শুরু হয়। এ আন্দোলন সংগঠিত করে বাংলার খেটে-খাওয়া কৃষিজীবী সম্প্রদায়েরা। ক্রমবর্দ্ধমান বঞ্চনা ও শোষণ থেকে মুক্তির জন্য এ আন্দোলন গড়ে ওঠে বঞ্চিত শোষিত কৃষিজীবী মানুষদের সংহত জনজাগরণে।

বঞ্চনা ও শোষণ ছিল মারাত্মক – বাংলাদেশের শতকরা চুয়াত্তর জন কৃষককে ভূমিহীন নানান উপদ্রবের মুখোমুখি হতে হত। চাষের সব খরচ বহন করে ও গতর দিয়ে খেটে যে ফসল তারা অপরের জমিতে ফলাত—সে ফসলের সিংহভাগই জমিদার বা জোতদাররা জুলুম করে কেড়ে নিত। ন্যায্য অর্ধেক ফসলের ভাগতো পেতই না—উল্টে তাদের ওপর নানা অত্যাচার করত তারা। ফলে কৃষকরা অন্নাভাবে দিন কাটাতে বাধ্য হতো।

‘তে-ভাগা আন্দোলন' নামকরণের পেছনে কৃষকদের যে দাবিটি নিহিত ছিল—তা হলো জমিদাররা বা জোতদাররা যদি চাষের খরচের অর্ধেক বহন করতে রাজি না হয়, তাহলে কৃষকেরা মোট উৎপাদিত ফসলের তিনভাগের দুভাগ নিজেরা নেবে, আর এক ভাগ দেবে জমির মালিককে। এছাড়া যেহেতু ভাগচাষীদের কোনো প্রজাস্বত্বের অধিকার ছিল না, সেহেতু তাকে যে কোনো সময় উচ্ছেদ হতে হবে এই ভয়ও তে-ভাগা আন্দোলনকে উজ্জীবিত করে বলা যায়। কৃষক সচেতনতা মূলত গড়ে ওঠে তে-ভাগা আন্দোলনের রূপরেখায়।

এই তে-ভাগা আন্দোলনের পেছনে ছিল কৃষকদের সঞ্জীভূত দুঃসহ যন্ত্রণার জ্বালা ও তীব্র ক্ষোভ। ১৯৪৩-এর বাংলাদেশের মন্বন্তরের ফলে ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে দুর্ভিক্ষ যখন ব্যাপক আকার ধারণ করে তখনই কৃষকেরা সচেতন হয় এবং ধীরে ধীরে জোতদার ও পাইকারী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলতে থাকেন গান গেয়ে। তারপর ১১৪৬-এর শেষে রংপুর, দিনাজপুর এবং জলপাইগুড়ির ক্ষুধাক্লিষ্ট মানুষেরা কৃষকসভার মাধ্যমে গোপন মজুত খাদ্য টেনে বার করতে নামে। নভেম্বর মাসেই তে-ভ আন্দোলন এমন ব্যাপক ভয়ঙ্কর রূপ নেয় যে জোর করে সংগঠিত শক্তির সাহ মাঠের সব ফসল অধিকার করা হয় জমিদার বা জোতদারদের সব শক্তি উপেক্ষা করে। এই কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে বামপন্থী মার্কসবাদে দীক্ষিত লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত জড়িয়ে পড়েছিলেন একজন রাজনৈতিক সক্রিয় সদস্য হিসেবে। হারানে নাতজামাই' গল্পটি যে লেখকের কল্পনাশক্তির ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠেনি, গল্পটি ে তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতার ফসল তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কমল চট্টোপাধ্যায়ের ১৯৪৯ এর একটি লেখা থেকে যার সমর্থন মেলে। (রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের “স্বাধীনতা উ বাংলা ছোটগল্প” গ্রন্থে)। কমলবাবু জানিয়েছেন— 'একদিন দিয়ারা স্টেশনে নেমে বড়কমলপুরে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে এক লম্বা-চওড়া লোক—পায়ে বুট জুতো, দেখেই চিনে ফেলি – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। এখানকার আন্দোলনে পুলিশকে ফাঁকি দেওয়ার ধরন দেখে তিনি লেখেন, হারানের নাতজামাই' গল্পটি। বলতে নেই—এই বড় কমলপুরেই তে-ভাগা আন্দোলন একসময় তীব্র রূপ নিয়েছিল। গল্পটি যে তে-ভাগা আন্দেলনের প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে তা গল্পটির ভেতর লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে কৃষকদের খেদোক্তির মধ্যে।
তবে, তে-ভাগা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গল্পটি গড়ে উঠলেও গল্পটি কিন্তু গতি ছাড়িয়ে ব্যাপকতার পটভূমিতে অবতীর্ণ হয়ে কালোত্তীর্ণ সাহিত্য হয়ে উঠেছে তা আমরা নিঃসন্দেহে মেনে নিতে পারি। শুধু তে-ভাগা আন্দোলনের রূপরেখার গণ্ডীবদ্ধ গল্প না থেকে ‘হারানের নাতজামাই' গল্পটি হয়ে উঠেছে চিরবঞ্চিত শোষিত মানুষের চিরকালীন এক জীবনসংগ্রামী জনজাগরণের গল্প। গল্পটির আসল তাৎপর্য যেমন এখানেই, তেমনি লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যে কত বড় জীবনদরদী মানবতাবাদী শিল্পী-লেখক ছিলেন তার স্বাক্ষরও এটি। একটি কথা এ গল্পটি সম্পর্কে বলা বোধকরি উচিত হবে, 'হারানের নাতজামাই' গল্পটিতে আমরা পরাজিত ধ্বস্ত মানুষকে চাঙ্গা করা ও জীবনচেতনার উজ্জ্বল অঙ্গীকারে শূন্যহৃদয়ে প্রকৃত বিশ্বাস ও অফুরন্ত অক্সিজেন ভরে দেওয়ার গল্প হিসেবে খুব সহজেই চিহ্নিত করতে পারি। কাজেই 'হারানের নাতজামাই" গল্পটি যে লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক অনবদ্য শিল্পকর্ম তা সোচ্চারে বলতে বাধে না,।।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Accept !) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !
To Top