সমান্তরালবাদ তত্ত্বটির সবিচার ব্যাখ্যা দাও | The University Of Burdwan

Official
0

সমান্তরালবাদ  তত্ত্বটির সবিচার ব্যাখ্যা দাও !




স্পিনোজার মতে, অধীন জগৎ ব্যবস্থা একটাই, দেহ এবং মনের দুটি ব্যবস্থা নয়। তবে বিশ্ব ব্যবস্থা একটা হলেও তাকে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যায় – চিন্তন গুণের অথবা বিস্তার গুণের দৃষ্টকোণ থেকে। বিস্তার গুণের প্রত্যেকটি বিকারের পাশাপাশি চিন্তন গুণের এক একটি বিকার থাকে, – চিন্তন গ্রুপের এপ্রকার সমান্তর (paralleled) বিকার কে স্পিনোজা 'ধারণা' (idea) বলেছেন। তাহলে, স্পিনোজার মতে, প্রতিটি নৈতিক অবস্থার পাশাপাশি মানসিক অবস্থা (অর্থাৎ 'ধারণা') থাকে এবং প্রতিটি মানসিক অবস্থার পাশাপাশি দৈহিক অবস্থা থাকে। অর্থাৎ দৈহিক পরিবর্তন হলে মানসিক পরিবর্তন ঘটে এবং মানসিক পরিবর্তন হলে দৈহিক পরিবর্তন ঘটে।

 তবে, দৈহিক অবস্থা ও মানসিক অবস্থার এ প্রকার পরিবর্তন ঘটলেও সেই দুটি অবস্থার মধ্যে কোন কার্য কারণ সম্পর্ক নেই।তবে, দৈহিক অবস্থা ও মানসিক অবস্থা একই মূল সত্তার দুটি ভিন্ন দিক, তাদের মধ্যে ইলগতভাবে কোন প্রভেদ নেই'—একথা বললে এমন বোঝায় না যে, দৈহিক দশাকে মানসিক দশার মাধ্যমে অথবা মানসিক দশাকে দৈহিক দশার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা চলে। 

এ প্রসঙ্গে স্পিনোজার অভিমত হল, কোন বিশেষ বস্তুকে যদি আমরা বিস্তার গুণের বিকার দৈহিক অবস্থারূপে গণ্য করি তাহলে সেই সমগ্র ব্যবস্থাটিকে (system) বিস্তার গুণের বিকার দৈহিকদশার মাধ্যমেই ব্যাখ্যা করতে হবে— দৈহিক দশাকে মানসিক দশায় অথবা মানসিক দশাকেদৈহিক দশায় পরিণত করার প্রচেষ্টাটি হবে অর্থহীন। যদিও অসীম বিশ্ব-ব্যবস্থা একই দুটি নয় তথাপি যদি আমরা প্রকৃতি রাজ্যের কোন বস্তু বা বিষয়কে বিশেষ এক গুণেরবিকাররূপে গণ্য করি, তাহলে সেই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিতেই তার ব্যাখ্যা দিতে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। অর্থাৎ দৈহিক দশার ব্যাখ্যায় দৈহিক দশাকে এবং মানসিক দশার ব্যাখ্যার মানসি দশাকে উল্লেখ করতে হবে ।


স্পিনোজার সমান্তরবাদ নানাভাবে সমালোচিত হয়েছে : প্রথমত, অভিযোগ হল, স্পিনোজার সমান্তরবাদ সর্বমনবাদ বা মন্ময়বাদে (psychism) পরিণত হয়। যদি বলা হয়, যেখানেই দেহ সেখানেই মন, তাহলে জগতের ছড় মন বা চেতনা আছে, এমন মানতে হয়। আমাদের দেহে প্রতিনিয়ত নানা পরিবর্তন ঘটে চলেছে — পাকযন্ত্রের, রক্তবাহী ধমনীর, বিভিন্ন গ্রন্থী ইত্যাদির পরিবর্তন— বাদের সম্বন্ধে আমাদের কোন চেতনাই থাকে না। জড় পদার্থ— পাহাড়, পর্বত, নদী, ঘরবাড়ি ইত্যাদি—অবয়বী অর্থাৎ তাদের দেহ আছে। কিন্তু এসব পদার্থের, তাদের অণু-পরমাণুর মন বা চেতনা আছে, এমন বলা চলে না। কাজেই স্পিনোজার অভিমত অনুসরণ করে এমন মেলা সঙ্গত হবে না যে, যেখানেই দেহ সেখানেই চেতনা আছে।

দ্বিতীয়ত, এমন বলাও সঙ্গত হবে না যে, প্রতিটি মানসবৃত্তির সমান্তরাল দৈহিকবৃত্তি আছে।আধুনিক মনোবিদদের মতে, আমাদের নিজ্ঞান মানুষ বৃত্তি আছে যদিও এইসব নিজ্ঞান ব্যক্তির সমান্তরাল কোন দৈহিক বৃত্তের উল্লেখ করা যায় না। তেমনি কোন জটিল গণিতিক বা দার্শনিক সমস্যার বিমূর্ত চিন্তার সমান্তরাল কোন দৈহিক দশা বা অবস্থার উল্লেখ করা যায় না।

তৃতীয়ত, স্পিনোজার অভিমত মানলে এটাও মানতে হয় যে, মন দেহ-নির্ভর। মানুষের মনতুমি দেহের ধারণা হয় (যা স্পিনোজা বলেছেন) তাহলে এটাও মানতে হয় যে, দেহের সংগঠিত ব্যবস্থাব্যবস্থা যত বেশি উন্নত হয় মনের চেতনাও তত বেশি স্পষ্ট হয়, অর্থাৎ মনের উৎকর্ষ নির্ভর করে দেহের উৎকর্ষের ওপর। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, পরীক্ষানিরীক্ষা- আধুনিক বিজ্ঞানেও এমন অভিমত পোষণ করা হয়। পার্থক্য হল বৈজ্ঞানিক মতবাদ অভিজ্ঞতা-নির্ভর, আর স্পিনোজার অভিমত হল অভিজ্ঞতা-নিরপেক্ষ ন্যায়গত অবরোহ পদ্ধতি- চর্ভর। মানসবৃত্তি কীভাবে এবং কতটা দৈহিকবৃত্তি-নির্ভর?—এমন প্রশ্নের সমাধান অভিজ্ঞতা- নিরপেক্ষ যৌলিক পদ্ধতিতে সম্ভব নয়। 

চতুর্থত, মন যদি দেহ-নির্ভর হয় তাহলে দেহের মতো মনও হবে যান্ত্রিক, যান্ত্রিক নিয়মে পরিচালিত। কিন্তু মনের সব বৃত্তিকে যান্ত্রিক নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না। অনুরাগ, উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা ইত্যাদি মানসিক ব্যাপারের যান্ত্রিক ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। দৈহিক ঘটনা মাত্রেরই হাট্রিক ব্যাখ্যা সম্ভব হলেও মানসিক ঘটনা মারেরই যান্ত্রিক ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হয় না। 'কাজেই মাসবৃত্তি মাত্রেই দৈহিক বৃত্তির সমান্তরাল, এমন চিন্তা সঙ্গত হতে পারে না।

পঞ্চমত, ব্যাক্তি মনের উদ্দেশ্য, অভিপ্রায়, অনুরাগ, পরিকল্পনা ইত্যাদির উল্লেখ করে পিনোজা পরোক্ষভাবে ব্যক্তিমনের স্বতন্ত্র সত্তাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন, যা তাঁর দ্রব্যতত্ত্ব বিরোধী। বালি মনের উদ্দেশ্য অনুরাগ ইত্যাদির উল্লেখ করলে অসংখ্য ব্যক্তিমন স্বীকার করতে হয়, কেননা উদ্দেশ্য, অনুরাগ প্রভৃতি সব মানুষের একরকম হয় না, ভিন্ন ভিন্ন হয়। তাহলে মানতে হয়, এই জগতে অসংখ্য ব্যক্তিমন স্বতন্ত্রভাবে আছে। এভাবে, ব্যক্তিমনের স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করা হলে স্পিনোজার একত্ববাদ বা অদ্বৈতবাদ অবশেষে চিৎপরমাণুবাদে পর্যবসিত হয়।


সর্বোপরি, মন এক অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে পরিণত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যাপেনডিকসকে (appendix) যেমন দেহের অঙ্গরূপে স্বীকার করা হলেও প্রয়োজনীয় অঙ্গরূপে স্বীকার করা হয় না, সমান্তরবাদেও তেমনি মনের এক আলঙ্কারিক মূল্য স্বীকার করা জীবনের প্রয়োজনীয় বিষয়রূপে স্বীকার করা যায় না।

 সমান্তরবাদ অনুসারে, আমাদের দেহের ওপর মনের কোন প্রভাব নেই, নিয়ন্ত্রণ নেই। আমাদের জীবনে মন যেন এক অকেজো বিষয়রূপে আছে। কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত বিশ্ব-বিবর্তনের দিক থেকে এমন ধারণা বাস্ত বলে প্রমাণিত হয়। জীবজগতের বিবর্তনের ইতিহাস নিবিষ্টভাবে লক্ষ করলে দেখা যায়, জীবনযুদ্ধে জীবের কাছে যা নিষ্প্রয়োজনীয় বা অকেজো হয়েছে, ক্রমশই তার বিলোপ ঘটেছে, জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার জন্য যা প্রয়োজনীয় তাই কেবল টিকে আছে।

 কিন্তু, মানুষের মনের আবির্ভাবের পর তার তিরোধান ঘটেনি, বরঞ্চ দেখা যায়, মানুষের জীবনে মনের গুরুত্ব ও প্রাধান্য ক্রমশই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আমাদের অভিজ্ঞতায় এটা অনস্বীকার্য যে, হে অপেক্ষা মন অনেক উন্নতমানের এবং মন আমাদের দেহকে প্রায়শই নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে। বিবর্তনের ইতিহাসে এজন্য মনের আবির্ভাবকে কখনই অপ্রয়োজনীয় মনে করা চলে। না। মানুষের যেমন দেহ আছে তেমনি মন আছে এবং দেহ যেমন ক্ষেত্রবিশেষে মনকে প্রভাবিত করে, মনও তেমনি ক্ষেত্রবিশেষে দেহকে প্রভাবিত করে। দেহ-মনের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না।



Thank You

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Accept !) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !
To Top